লকডাউন এবং আপনার টিনএজার সন্তানটি

প্রায় দেড় মাসের ওপর হয়ে গেল আমরা সবাই বাড়িতে। প্রথম অবস্থায় সবার মধ্যেই একটা উত্তেজনা এবং স্ট্রেস কাজ করছিল, নতুন নিয়মকানুনে থাকতে হবে, হাইজিন সম্বন্ধে ওয়াকিবহল হতে  হবে, খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রাম পর্যাপ্ত পরিমাণে নিতে হবে … ইত্যাদি। বেশ কিছুদিন আমরা সবাই অন্যমনস্ক  ছিলাম এসব নিয়ম পালন করতে। কিন্তু এখন সবটাই  বেশ একঘেয়ে হয়ে গেছে যেন।  সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়, আবার একটা দিন অবিকল আগের দিনগুলোর মতনই কাটবে, কোথাও কোন  বৈচিত্র্য নেই, রুটিনের বদল নেই। 

এই পরিস্থিতিতে যারা সবচেয়ে অসুবিধায় পড়েছে তারা হল আমাদের টিনএজার সন্তানেরা। এদের প্রাত্যাহিক জীবন ছিল তীব্র গতিশীল। স্কুল, টিউশন, নাচ, গান, মুভি দেখা, বন্ধুদের সাথে গল্প, আড্ডা, সাজগোজ… কি না ছিল না সেই তালিকায়! 

সবটাই এখন স্তব্ধ। যেটুকু গতিশীলতা রয়েছে তা শুধু মোবাইল র স্ক্রীন এ। সেখানেই ওরা আকাশ খোঁজে। তাই এই সময় খুব সংবেদনশীলতার সাথে ওদের পাশে থাকুন। অভিভাবকদের জন্য এই বিষয়ে রইল কিছু সহজ পরামর্শ। 

১। বলুন কম, শুনুন বেশি

প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বার করুন ওদের জন্য। অবশ্যই ওদের সুবিধামতন সময় দেখে। সেই সময়ে ওদের সাথে সহজভাবে কোথা বলুন, প্রতিদিনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা গুলো জানতে চান, মন খারাপের কারণগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। নিজে বলার থেকে বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিন ওদের কথা শোনার জন্য। 

২। ওদের নিজস্ব সময় দিন

চেষ্টা করুন দিনে অন্তত এক বা দু ঘণ্টা ওদের নিজেদের মতন করে কাটাতে দিন, খুব বেশি বিধিনিষেধ প্রয়োগ করবেন না। সে সময় ওরা ওদের মানসিক চাপকে কিছুটা হলেও  দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে। 

৩। পড়াশোনায় সাহায্য করুন

অনেকেই এই সময় স্কুল এবং টিউশন ক্লাস গুলোর তৎপরতায় অনলাইন ক্লাস করছে। আমরা অনেকসময়ই ধরে নিই ওদের কাছে এই ধরনের প্রযুক্তি কোন সমস্যাই নয়, কিন্তু হতে পারে অনেক সময় ওরা বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারছে না, বা নতুন নিয়মের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে। ওদের মন খুলে সমস্যাগুলো বলার সুযোগ দিন,  ওদের পাশে থাকার আশ্বাস দিন এরকম সময়।

৪। নির্দেশ নয়, অনুরোধ 

এই পরিস্থিতিতে বাড়ির যাবতীয় কাজ সবারই বেড়ে গেছে। তাই পরিবারের সবাইকেই বিভিন্ন কাজের দ্বায়িত্ব নিতে হচ্ছে।

টিনএজারদের ক্ষেত্রে অনেকসময়ই আমরা নির্দেশমূলক পদ্ধতিতে ওদের কাজ করতে বলি যা সঠিক নয়। কিন্তু যদি সেই একই কাজ অনুরোধের সুরে বলি অনেক বেশি উৎসাহ নিয়ে ওরা কাজ করবে। 

৫। মাঝে মাঝে ওদের ইচ্ছের সাথে তাল মেলান 

ওদের পছন্দ আর আমাদের পছন্দের মধ্যে ফারাক তো থাকবেই, কিন্তু মাঝে মাঝে ওদের ইচ্ছের বিষয়গুলোর প্রতি উৎসাহ দেখান খুব প্রয়োজন। হয়ত রক মিউজিক শুনতে আপনার  একদম ভাল লাগে না, কিন্তু এক আধ দিন, ওদের সাথে শুনলে কি মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়বে? কখনওই নয়। বরং ওদের সাথে আমাদের কথা বলার একটা পথ তৈরি হবে। আপনি ওদের পছন্দ কে গুরুত্ব দিলে ওরাও  আপনার পছন্দের মর্যাদা দিতে শিখবে। 

৬। বয়স ওদের স্বপ্ন দেখার 

ওদের কল্পনার জগতকে সবসময় বাস্তবে টেনে এনে নামাবেন না। এ বয়সে ওদের মনে কতরকম স্বপ্ন দানা বাঁধবে। কেউ রক সিংগার হতে চায়, কেউ বা ফ্যাশন ডিজাইনার, কেউ অভিনেত্রী… সেই নিয়ে তর্কবিতর্ক করা বন্ধ করুন, বরং সেই স্বপ্ন দেখার সাথে সাথে পড়াশোনার করার ইচ্ছেটাও জিইয়ে রাখার চেষ্টা করতে বলুন ওদের। অনেক সহজ হয়ে যাবে আপনাদের সাথে ওদের সম্পর্কের বন্ধন।

প্রশংসা, উৎসাহ, গল্প, আলোচনা, পারিবারিক বৈঠক… নিয়মিত এসবের মাধ্যমে আপনার ও আপনার টিন এজার সন্তানটির সাথে ইতিবাচক মেলবন্ধন তৈরি করুন এই লকডাউন পরিস্থিতিতে।